আশান উজ জামান

দেখা। লেখা। পড়া

জেল থেকে বাড়ি ফিরল কলিম। দিব্যি ভালো মানুষ। দু’মাস না যেতেই পাগল হয়ে গেল।
বছরখানেক আগের কথা। মা মারা গেল আষাঢ়ের পয়লায়। চল্লিশার তোড়জোর চলছে। বস্তাতিনেক চাল আর দুটো খাসি নিয়ে এসেছে ছোটমামা। কথায় কথায় সে-ই তুলল কথাটা।
‘কী যে কষ্ট কলিম চুরার তা বলে বুজোনো যাবে নাই। খাবলা খাবলা মাটি খায়। গালাগালি দ্যায়। আর ড্যালা মারে এদিক ওদিক। কাচে ঘেষতি পারে না কেউ। আবার কিচুনা কিচুনা হাওমাও করে কান্দে।’
এ অবস্থা খানিকটা আনুর কারণেই। তাই ঠিক করেছিল গিয়ে একবার মাফ চেয়ে নেবে।
তা যাবো বললেই কি যাওয়া যায়? ব্যস্ততা এমন, ফুরসতই হয়নি। তবে এবার আর না গেলেই নয়। লোকটার নাকি এখন তখন অবস্থা। চোখের দেখাটা অন্তত দেখা উচিৎ।
কোদালপোঁতা যাবার রাস্তাটা এমন, বৃষ্টির নাম শুনলেই যেন কাদা জমে যাবে। তায় এবার বর্ষাও হয়েছে ভারী। ভাগ্যিস গত সপ্তাটা শুকো ছিল, মুখ তুলেছে হাঁটাপথ। কোথাও কোথাও অবশ্য পানি আর প্যাচপেচে কাদারই রাজত্ব। বিচালি ইট কাঠ বিছিয়ে চলার ব্যবস্থা করেছে গ্রামবাসী। সাবধানে চালাতে হচ্ছে বাইক। তাও ভালো, আগে তো বর্ষায় এ পথে আসার কথা ভাবলেও জ্বর আসত। এঁটেল মাটির কাদা। আর ডোবায় পচা পানি। দখল নিত হাঁটু পর্যন্ত।
তা পথের কষ্ট কি আর নানাবাড়ির ঠিকানা ভুলিয়ে রাখতে পারে? সুযোগ হলেই তাই ছুটে আসত আনু। তারপর খুনসুটি আর বায়নাভরা দিনগুলো বয়ে যেত খুশির স্রোতে।
সে স্রোত নিভে গেছে। নানা নানি নেই। বিয়ে হয়ে গেছে ছোটমামার। মিনুু খালারও।
মা’র চাচাতো বোন মিনু খালা। বয়সে ওর চেয়ে একটু বড় হলেও বন্ধুর মতোই মিশত ওরা। খেলে বেড়াত হাজার রঙের খেলা। পলানটুক। গাদি। গোল্লাছুট। কাটেনকুট। সবচে’ মজার ছিল বউ বউ খেলা। আনু হতো বর, খালা বউ। মিথ্যেমিথ্যি প্রেম। সত্যিসত্যি ঝগড়া। কী যে নিবিড় সেই ধুলো-কাদার সংসার! মাঝে মাঝে মারামারিও লাগত। ভাবলে হাসি পায় এখন। লজ্জাও।
রিনিবু’র সাতে কলিম চুরার লাইন ছিল, জানিস?
কোনো এক খেলার ফাঁকে বলেছিল মিনুু খালা।
আনু তখন এইটে পড়ে। লাইন করতে শেখেনি। কিন্তু ব্যাপারটা বোঝে। হাবুডুবু হাবুডুবু দুটো জুটিকে সে চেনেও। কার সাথে কার এটা হতে পারে কার সাথে কার পারে না সে ধারণা ছিল। তাই বিশ্বাস হয়নি। মার সম্পর্ক আর যার সাথেই হোক, ওই লোকটার সাথে হওয়ার কথা না।
কলিমের বাবা ছিল না। মা বিয়ে করেছিল। থাকত সে নানির সাথে। ভালোবাসার আর কেউ ছিল না। তাই শাসনও করেনি কেউ। ফলে এগোয়নি পড়াশোনা। যার তার সাথে মিশত। যেখানে সেখানে যেত। চলায় বলায় বেয়াড়া ভাব। মান্যগন্য করত না কাউকে। সাথে ছিল হাতটান। গোলার ধান থেকে পুকুরের মাছ- সবই নিত সে। শ্যালো মেশিন বা টিউবয়েলের হাতলও বাদ যেত না।
দিনে দিনে তাই চোরের খ্যাতি বাড়ল। নামও বদলাল। কলিম উদ্দিন থেকে কলিম চোরা।
যদিও ভালো ফুটবলার ছিল সে। হায়ারে খেলতে যেত। আর ছিল গানের গলা। গাইতো পাগল করা সুরে। মাতাল করা স্বরে। তবু কেউ পছন্দ করত না ছেলেটাকে। এক রিনি ছাড়া। লোকে বলত সরদার বাড়ির এই মেয়েটার মাথায় দোষ। না হলে চোরটার জন্য পাগল হবে কেন? আর হবেই যদি, লোক জানবে কেন তা?
প্রেমের খবর সচল খুব। এক কান থেকে দু’কান হয়। দু’কান থেকে দোকান। দোকান থেকে গ্রাম। গ্রাম থেকে বাজার। রিনির কথাও ঘুরলো মুখে মুখে।
তারপর যা হওয়ার হলো ঠিক তা-ই। বিয়ে হয়ে গেল রিনির।
পাড়ার ছেলেরা খুব মনমরা হয়ে থাকল। খেতে শুতে মন চায় না। সময়ে অসময়ে রিনির কথা মনে পড়ে। খা খা করে বুক, করে চিনচিন। তবে ওর বরটা কিন্তু বেশ। জমিজায়গা অনেক। টাকাপয়সারও কমতি নেই। ব্যবসায়ী মানুষ..
ব্যপসায়ী না ছাই! ব্ল্যাক মার্কেটের ব্যপশা আবার ব্যপশা নাকি?
তবু। চোরের চেয়ে চোরাকারবারি ভালো। শুধু ভালো না, ঢের ভালো।
তা তুমরা যাই বলো বাপু, আঁচেতথে বাঁচাতি হাবিসদ্দার আগুনিই ফেলেচ মেয়েটাক। পুড়া কপাল। নইলি কি আর বাপের বয়সী বর জোটে!
কলিমকে এসব টানত না। সে ছিল অস্বাভাবিকরকম স্বাভাবিক। তার যেন যায়নি কিছু। আসেওনি।
লোকে তাই ধরেই নিল কোন মতলব আঁটছে ছোড়াটা। সময়মত কোপ দেবে। কিছুদিন পর সত্যিই ডাকাত পড়ল সরদার বাড়ি। আর তাকে ধরে নিয়ে গেল পুলিশ।
কতবার লোকটাকে দেখেছে আনু। চুরি ডাকাতি করে। কিন্তু দেখে তা মনে হয় না। তার গানও শুনেছে। ভোমর কইয়ো গিয়া। মরমিয়া তুমি চলে গেলে। কিম্বা আরেকবার আসিয়া যাও মোরে কান্দাইয়া। নানার দোতালার ঘর থেকে শোনা যায়। গান আনুর পছন্দ খুব। কলিমের গান শুনতে ভালোও লাগে। তবু। কখনোই আগ্রহ হয়নি লোকটার প্রতি।
কী দেখে একে ভালোবেসেছিল মা? সত্যিই কি বেসেছিল? নাকি লোকের বানানো সব?
প্রশ্নগুলো এড়ানো যেমন যায় না, করাও যায় না সহজে। করা লাগেও না। হঠাতই একদিন চলে আসে উত্তরগুলো আনুর কাছে।
তখন গরমকাল। স্কুল থেকে ফিরেই ঘুমুতে হয়। কিন্তু ঘুম আসে না গরমে। মা তাই বাতাস করেন। আর ঝিমোন। মা-ছেলের এই অবকাশটুকু মধুর মতো। গাঢ়, আর উপাদেয়। মধুমাখা সেই অলস বিকেলটাই তিতকুটে হয়ে উঠল সেদিন।
শেলিফু মা’র পাড়াতো ননদ। তখনকার সবচে’ কাছের মানুষ। সময়ে আসে, অসময়ে আসে। দরকারি অদরকারি আলাপ করে। গোপন গোপন কথা বলে। যুক্তি পরামর্শ হা হা হো হো চলে। সেদিনও চলছিল।
কেবল শুয়েছে আনু। ছেলেদের হৈচৈ কানে আসছে। মন যাচ্ছে ছুটে। তাই গাঢ় হয়নি ঘুম। ফুফুর সরব ফিসফিসানি আর কেমন কেমন সুবাস আর চারপাশের তাপে সেটা হালকা হলো আরও। পাশ ফিরে শোবে, তখনই কানে গেল কথাটা। ব্যাপারটা একটু বেশিই গোপন। আনুর সেটা শুনতে নেই। শুনলে অস্থির লাগে। ঘুম আসে না। ধুকপুক করতে লাগল বুক।
মা ফুফুরও কী হয়েছিল সেদিন কে জানে। আগল সব খুলে দিয়েছিল। গল্পের পাখা গজিয়েছিল। এ গাঁয়ে যাচ্ছিল সে। এর ঘরে ঢুকছিল। ওর উঠোনে হাসছিল। তারই লেজ ধরে উঠে এসেছিল কলিম চোরা। এসেছিল তার সমস্ত রহস্য নিয়ে। আর অবাক ভীষণ ধৈর্য্য নিয়ে। মা ফিরেছিলেন কৈশোরে। পলকা হাওয়ার চপলতা নিয়ে। আর কাঁচামিঠা আবেগ নিয়ে।
সেই সুমায় ছেলেরা তো আমার জন্যি পাগল। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় থাকতো। এট্টু কতা বলতি পারলি, ছুতোনাতায় এট্টু ছুতি পারলি কী আনন্দ ওদের! সব বুজতাম। কলিম ভাই ছিল এদেরচে আলাদা। চুপচাপ থাকত। নিজির মতো গান কইত্তো। খেলত। কুদালপুতায় তো গিইচিস তুই। মেজেভাই একন ঘর তুলেচে যেকেনে, ওকেনে এ্যট্টা নারকেল গাচ ছিল। পুরো মাট দেকা যেত ওকেনতে। ধান উটলি মাটের মদ্যি খেলা ক’রতো ছেলেরা। আমার সেজেবুনডা তকন ছোট। কোলে নিয়ে ওকেনে গিয়ে দাড়াতাম। হাটাহাটি করতাম। আর খেলা দ্যাকতাম। খেলার কিচু কি বুজতাম? আমি শুদু কলিম ভাইক দ্যাকতাম। ম্যাচ জিতলি তাক কান্দে তুলে নিত ছেলেরা। কী যে ভালো লাইগতো!
ভালোলাগাটা বদলে গিয়েছিল। সুযোগ বুঝে বদল হয়েছিল মনও।
খেলার সময় ছাড়া তাদের দেখা হতো কম। কথা হতো আরো কম। সেটা পুষিয়ে যেত কলিমের গানে।
কলিমদের ছোট্ট উঠোন। পাশে আরও ছোট কুয়ো। কুয়োর পাড়ে সজনে গাছ। সজনে তলায় ঢেঁকি। তাতে বসে কলিম টান দিত গলায়। কুয়োর জল ছুঁয়ে, জোনাকির আলো মেখে, আঁধারের ফাঁক গ’লে সে টান পৌঁছোত সরদারবাড়ি। বিঁধে যেত রিনির বুকে। আঁধার ততক্ষণে জমে গেছে বাঁশের ঝাঁড়ে। পুকুর পাড়ে। গাছের সারে। তবু আলো হয়ে থাকত রিনির মুখ। তার পৃথিবী তখন আলোকিত। সুরময়।
‘তাই বলে এ্যট্টা চোরকে ভালোবাসতি হবে?’
‘তুইও দেকি লোকের মতো বল্লি! ছেলেরা আম কাটাল চুরি করে খায় না? খালিই কি তারা চোর? আনুর মামুরাও খেতো। আনুও তো খেজুর রস চুরি কত্তি যায়। উরা কি চোর? মাচ সব পাকিই খায়, দোস হয় মাচরাঙার।’
শুনতে শুনতে আনুর মনে হয় যেন সে ঢালির বউ। মোড়ের মাথায় টং দোকানে বসে আছে। নুন ডাল মাপার রোগাপটকা দাড়িপাল্লাটা ঝুলছে সামনে তার। এক পাল্লায় বসে আছে তুহিনচাচা আর শিউলি। আরটায় বসা মা আর কলিম। ঢালির বউয়ের মতোই ওজন করতে থাকে আনু। গোল চোখ আরো গোল করে নজর রাখে পাল্লাদুটোয়। দেখা যায়, আড়ালে আবডাবে দেখা হচ্ছে দুজনের। কথা হচ্ছে ঘন ভারি। লোক দেখলেই পালিয়ে যাচ্ছে। কখন দেখা হবে? আবার কখন শ্বাস? প্রশ্নগুলো আঁকা হচ্ছে চোখে, চিবুকে। সব যেন চিনতে পারছে আনু। মাকে তাই অচেনা লাগছে খুব।
অচেনা মা তার গল্প বলছে। চোখ ভরা পেছনের ছায়া। বুক ভরা অতীতের মায়া। কথার ফাঁকে নীরবতার সুর। দীর্ঘশ্বাসের বাজনা। গানের মতো বেজে চলে স্মৃতির কাহন।
‘আমার শাউড়িক তো তুই দেকিসনি। জাঁহাবাজ জাঁদরেল লোক ছিল। আর সেরাম সুন্দুরি। গায় টুকা দিলি লাল হয়ে থাইকতো। রূপির দিমাগ ছিল। প্রতম প্রতম তাই যন্তনা দিয়েচ খুব। আমার রং পচন্দ হইনি তার। তায় আবার ছিলাম রুগাপটকা। দুদিন গেলিই অসুকি পড়তাম। কাজ কত্তি পাত্তাম না। সেজন্যিই জ্বালাতো। আনুর বাপ তো খুব ব্যস্ত তকন। ইন্ডিয়া যাতি হ’তো। বর্ডারে থাকতি হ’তো। সপ্তা দুসপ্তা বাড়িই আইসতো না কোনো কোনো সুমায়। আসলি জ্বালা বাইড়তো আরো। মা ছেলে দুজন মিলেই ঝাড়তো। কত মেরেচে। কিচু এট্টা হলিই বলতো রাকপে না আর। তালাক দেবে। দিনকে দিন যন্তনা বাড়চিলো। মনে হ’তো সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই। তকন ওর নানা বেঁচে’। মন ছুটলিই চলে যাতাম। আব্বা শুদু ধইয্য ধত্তি বইলতো। দেকা হলি কলিম ভাইও সাওস দিত। বলত ঠিক হয়ে যাবে সব।’
ঠিকই ঠিক হয়ে গিয়েছিল সব। দ্বিতীয় বছরেই জ্বলে উঠল আনু। তার আলোয় মুছে গেল আঁধার যত।
একন আর যুগাযোগ নেই লোকটার সাতে? একেনে কোনো দিন এয়েচ সে? জানতে ইচ্ছে করে ফুপুর। মা’রও বলতে ইচ্ছে করে।
না, লোকে কি না কি বলে, তাই আসতি নিশেদ করিলাম। একন তো আবুল মেম্বারের সাতে ঘোরে। খাওয়া পরার কষ্ট নেই। দেকা হলি আসতি বলি। বলে সুমায় পাইনে। থাকুক, ব্যস্ত থাকুক। সারাডা জীবন তো কষ্টই করে গ্যালো। একন এট্টু ভালো থাকুক মুানুষডা।
লোকটার প্রতি মা’র টানটা বোঝা যায়। বিপদে আপদে পাশে থেকেছে। সত্যিকারের এক ভালোবাসার মানুষ। রোদের সুখ পায়নি। তবু ভাগ নিয়েছে মেঘের। ভাগ নিয়েছে কষ্টের। চিকচিক করছিল মা’র চোখ। না দেখেও বুঝেছিল আনু। টুপ করে কয়েকটা মুক্তোদানাও কি পড়েছিল?
সূর্য হেলে গেছে। রামদীঘির মাঝামাঝি পড়ছে আনুর ছায়াটা। ছায়া বরাবর ওপারে তাকালেই নানাবাড়ি।
বাঁচা গেল। এতটা পথ হেঁটে আসা মুখের কথা? সেই শাহিবাড়ি মোড় থেকে। ওখানকার কালভার্ট ভাঙা। রাস্তা ধ্বসে গেছে খানিকটা। জায়গা পেয়ে মত্ত হয়ে উঠেছে পানি। এপাশ থেকে ওপাশে তার মিলনের ঢেউ। নড়বড় পায়ে সাঁকোটা পার হলো আনু। কিন্তু বাইকটা নেয়ার সাহস পেল না। রেখে এসেছে একটা বাবলা গাছের ছায়ায়।
আজ এদের হাটবার। মামারা কেউ বাড়ি নেই। ভাইয়েরাও বাজারে। তবু এত মানুষ, কুশল সারতেই সময় পার। তারপর হাতমুখ ধোয়া। তারপর খাওয়া।
খেতে খেতেই মনে পড়ল ঘটনাটা আবার।
কলিমের দায়িত্ব ছিল মেম্বারের দ্বিতীয় বউটার ফাইফরমাশ খাটা। কোথাও গেলে আসলে সঙ্গে থাকা। কত বিশ্বাসই না করত তাকে মেম্বার। নইলে এতবড় সম্পত্তির ভার তাকে দিত? আর সেই কিনা বউটাকে ভাগিয়ে নিয়ে গেল! কোনো মানুষ কি এত নিমকহারামী করে?
দুদিন ধরে জোর নিন্দা এলাকায়। তার মধ্যেই পাওয়া গেল বউটাকে। গায়ে কোপের ক্ষত। গলায় ফাঁসের দাগ। অবস্থা গুরুতর। কিন্তু কলিমের খোঁজ পাওয়া গেল না। পাওয়া গেল না টাকার ব্যাগটা। সোনাগয়নার বাকশোটাও হাওয়া।
ব্যবসার কাজে খুলনা গিয়েছিল আনু। ফেরার পথেই শুনলো এসব। চালানটা ভালো যায়নি। লোকসান গুনতে হবে। তার উপর এই ঘটনা। মা’র জন্যেই নাকি বিয়ে করেনি লোকটা। যে যা-ই বলুক, কলিম চোরার জন্য মায়া হতো তার। কিন্তু সেই ক্লান্ত বিকেলে, সেই পড়ে যাওয়া আলোয়, মায়াটা পরিণত হলো রাগে। রাগটা ফুঁসে উঠল বাড়ি ঢুকতেই। বারান্দায় বসে আছে কলিম! মাথা নোয়ানো। পানি ঢালছে কাজের মেয়েটা। মা রান্নাঘরে। পথ্য বানাচ্ছে!
পরশু মাঝরাতে এসেছে চোরটা। তখন থেকেই জ্বর। কমছে না।
না কমুক। মরুক শুয়োরের বাচ্চা। সালা খুনি! সারা দুনিয়ায় আর জায়গা পায়নি? মরতে এসেছে ওর বাড়ি! আনু বকাঝকা করে মাকে। সব জেনেও তাকে আশ্রয় দিয়েছে কেন জানতে চায়। এ্যটেম টু মাডার আর নারী নির্যাতন- দুটো কেস। তারাও তো ফেঁসে যেতে পারে।
মা বুঝতে চান না কিছুই। কলিম ভাই তাকে বলেছে সে নির্দোষ।
নির্দোষ? কচু খেয়ে সব শুয়োরই বলে খায়নি। রাগে আনু তেড়েফুঁড়ে যায়, মারবে লোকটাকে। না পেরে বের হয়ে যায়। শিকারপুর বেশি দূরে না। বাজারটা ছাড়ালেই ফাঁড়ি। সব মিলে মাইল দুয়েক পথ। যাওয়া আসায় চার।
পুলিশ দেখে ভড়কে যায় কলিম। পালাতে যায়, পারে না। ধরা পড়ে হাতপা ছোড়ে। চিৎকার করে। কিছু করেনি সে। কিচ্ছু জানে না।
গাড়িতে উঠে অবশ্য নীরব হয়ে যায় লোকটা। মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে থাকে, অপলক।
পাত্তা দেয় না আনু। পাকা চোরেরাই অমন ভোল পাল্টায় দফায় দফায়।
কথা ঠিক। কিন্তু সেদিন সেটা ঠিক ছিল না।
ভুলটা ভাঙে মাস আটেক পর।
কলিম আসলেই নির্দোষ। কী একটা আকামের জের ধরে আবুল মিয়াই কুপিয়েছিল বউকে। কিন্তু সামনে নির্বাচন। জানাজানি হলে বেকায়দা। তাই ওই রটনা। যার বলী হয়েছিল কলিম। পত্রিকায় সব পড়ার পর থেকে নিজেকে দুষেছে আনু। তার কারণেই অকারণ সাজা পোহাল লোকটা। তার কারণেই এই দুরবস্থা। বোধটা কুরে কুরে খায়।
খাওয়া শেষ। গামছা দিল এক ভাবী। আরেকজন নিয়ে এল দুধ। দেখেই হাসি পেল আনুর। কী পাগলই না ছিল ছোটকালে! খাওয়ার পর টাটকা দুধ না পেলে বাড়ি মাথায় তুলত। অভ্যাসটা ভুলেই গেছে প্রায়। কিন্তু মামি ভোলেনি। খাবার দিয়েই তাই দুধ দোহাতে গেছে।
কাঁচাদুধের গন্ধ আনুকে বাচ্চা করে তুলল আবার। মুখে লেগে থাকা দুধটুকু মুছল যেন সেই ছোট্ট আনু। নানাকে যেন বসে থাকতে দেখা গেল হাতলঅলা প্রাচীন চেয়ারটাতে। পাশেই বসে আছেন নানি, পানের বাটা হাতে।
ওই যে দুজন ছুটে গেল লিকলিকে পালোয়ান, ওরা কি আনু আর মিনু? দৌড়ে গিয়ে ওরাই কি ঝাঁপ দেবে রামদীঘির নকশাকাটা জলে?
ভাবতে ভাবতে চোখ পড়ল নানার ঘরের দিকে। কত্ত ছোট লাগছে সব। অথচ কী বিশাল মনে হতো সেসময়। দরজা জানলার তো নাগালই পেত না আনু। কীভাবে বদলে যায় সব!
বিকেল ততক্ষণ ক্লান্ত হয়ে গেছে। গড়িয়ে পড়েছে দোতলার ছাদে। বাতাসে আসন্ন সন্ধ্যার গন্ধ। আঁধারের আয়োজন চারপাশে।
গা ঝাড়া দিয়ে উঠল আনু।
এবাড়ির উঠোন। ওবাড়ির পেছন। একটু পথ। একটু গলি। তারপর কলিম চোরার কুঁড়ে। চেনা পথ। চেনা রূপ। সেই বুড়ো সজনে গাছ। মজা কুয়ো। তল্লাবাঁশের ঝাড়। আর সেই দোচালা।
বারান্দায় শুয়ে আছে কলিম। লুঙ্গি খোলা। পাঞ্জাবিটা ছেঁড়া। উঠছে আর নামছে পেট। গা-ভর্তি ময়লা। পাশেই এক থালা ভাত। উল্টে পড়েছে তরকারির বাটি। ভন ভন করছে মাছি। পেশাব পায়খানাও বোধহয় ওখানেই সারে লোকটা। নাক চাপতে হলো।
বোটকা গুমোট একটা বাতাস ভেসে বেড়াচ্ছে। সহ্য করা কঠিন। কেমন যেন লাগছে ওর। ভিতরে বিষ্ময়। একেই কি ভালোবেসেছিল মা! এ-ই কি ভালোবেসেছিল মাকে!
ডেকে কথা বলবে নাকি? ভুল স্বীকার করবে? কিছু টাকা দেবে হাতে?
সাহস হলো না। কিছু ফল নিয়ে এসেছিল। পায়ের কাছে রাখল।
আঁধার হয়ে এসেছে। মোটরসাইকেলটা পড়ে আছে রাস্তায়। মেয়েটাও বাপন্যাওটা খুব। সন্ধ্যায় তার একটাই খোঁজ। বাব্বা। বাপের বুকে ছাড়া ঘুমান না মহারাণী। মা বলত, আনুও নাকি এমন করেই ঘুমাত পিচ্চিকালে।
ভাবতে ভাবতেই রওনা হলো ও। পা চালিয়ে হাঁটছে। সবকিছু পেছনে পড়ে যাচ্ছে। ভাঙা ঘর। ভাঙা চাল। ঢেঁকির ভগ্নাবশেষ। শ্যাওলা ধরা উঠোন। বুজে যাওয়া পুকুর। মৃতপ্রায় বাঁশঝাড়। আর এই বিষণ্ন উৎকট সন্ধ্যা। পেছনে পড়ে যাচ্ছে।
আবার তাকালো ও লোকটার দিকে।
কাৎ হয়ে শুয়ে আছে। এক হাত মাথার নিচে। বালিশের মতো। আরেক হাত গুঁজে রাখা পায়ের ফাঁকে। পা দুটো জড়িয়ে আছে নিজেদের। নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরেছে উপর পাটির দাঁত। চোখদুটো আধবোজা।
নাহ! কোনোদিনই এমন করে ঘুমায়নি আনু। ভাবতেই বুকে বিঁধে থাকা সরু সন্দেহটা বেরিয়ে গেল। যেতেই আলো জ¦লে উঠল। যেন বিদ্যুৎ ছিল না এতদিন।

[২০১৫]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।