আশান উজ জামান

দেখা। লেখা। পড়া

“তুই তো আমার মায়ের মতো হাসতে পারিস/আকাশভরা আলোয় ভালো বাসতে পারিস/তাহলে তুই আমার মায়ের মা হয়ে যা/মা-হারা-মা’র কষ্ট যে আর সইতে পারি না।” গানটার জন্য বড় একটা পুরস্কার পেয়েছি। হাতে সেটা তুলে দিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বয়ং। তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রের জন্য সে তো বিশ্বজয়ের মতো। আনন্দে আটখানা হয়ে আছি। ছুটিতে বাড়ি গিয়েই বাবা-মাকে নিয়ে বসেছি গানটা শুনতে। বড় সুরকার-শিল্পীর আয়োজনে পিচ্চি ছেলেটার লেখা বুকে তাদের কেমন সুখের ঢেউ জাগায় দেখার কল্পনা করে কত রঙধনুই না বুনেছি; কিন্তু বাস্তবে দেখলাম রঙের বড় আকাল। একমুখ লাজুক হাসি আর দুইচোখ গদগদ কান্নায় মা বুঝিয়ে দিলেন যথার্থ আবেগ প্রকাশে তিনি ভীষণ আনাড়ী। বাবা যেহেতু তারই সহগ, তাকেই অনুসরণ করলেন। তবে তার অশ্রুতে চিকচিক করছে গর্বের আলো আর আক্ষেপের ছায়া। সেই ছায়া-ই কালি হয়ে জমতে লাগল বুকে আমার- এবার লেখা হবে বাবার জন্য গান। লিখিও, কিন্তু মনঃপুত হয় না একটাও। সবই যেন ক্লিশে, অন্যরা লিখে ফেলেছে, অথবা তাতে আমার ‘আব্বা’কে খুঁজে পাচ্ছি না। মন প্রাণ ঢেলে তাই খুঁজতে লাগলাম তাকে। আর খুঁজতে গিয়েই বুঝলাম, যে হাওয়ায় ডুবে থাকে মানুষ, যে শ্বাসে প্রাণ বাঁচে, দম আটকে আসার আগে তার খোঁজ খুব কমই মেলে। 

এমনিতে মানুষটা অতি সাধারণ, প্রায় চোখেই পড়ে না এমন। ‘এ নাষ্ট এহন কিডা চালাচ্চে কতি পারে না..’ ধরণের। কারো সাতেও নেই, পাঁচেও নেই; কারো সাথেও নেই, পাছেও নেই। ভাইবোনেরা সনদধারী হলেও তিনি বিশেষ নিরক্ষর। ফলে সবার জন্যই খাটতে হবে তাকে, কিন্তু তার জন্য কেউ ভাববেও না- এমন একটা নিয়ম চালু আছে। তিনি তাই তটস্থ থাকেন সবাইকে খুশি করার চেষ্টায়, সুখী করার তেষ্টায়। কত শ্রমে কত ঘাম জানেন না, খানিকটা গণ্ডারস্বভাবের মানুষ, জানেন শুধু খাটতে। ছুটির কোনো দিন নেই, ফলে প্রতিটা দিনই কাজের। বাইরে খাটেন গাধার মতো, খাটেন তিনি ঘরেও। বছরে দু’বছরে একবার দু’বার কুটুমবাড়ি যান, কোনো না কোনো ভাবে সেখানেও লেগে পড়েন কাজে। খাওয়া দাওয়া পাখির মতো, চলাফেরায় ঘোড়ার গতি, আর মোষের মতো ঘুম। গরর গরর নাক-ডাকা এক ঘুমেই তিনি স্বপ্ন দেখলেন- বাবা হয়েছেন। মাইল চারেক দূরে, মামাবাড়িতে, সত্যিই তখন সাদা শাপলার চোয়াল ছোঁয়া প্রথম ভোর হয়ে শ্বাস নিয়েছি আমি!

পরবর্তী দশ বছরে ভাইয়ে বোনে তিন হলাম আমরা। ফলে অভাব বাড়ল- তিনগুণ খরচের বিপরীতে স’মিল মিস্ত্রী বাবার আয় সেই আগের মতোই। ‘কাজডাও এত কটিন, করার ভয়ে বাঘ পলায়’। কিন্তু তিনি তো বাবা, তিনি তো বর, তিনি তো ছয় ভাইবোনের মধ্যে একজনই যার দায়িত্ব মাকে দেখা, না পালিয়ে তাই আরো বেশি মনযোগ দেন কাজে। আরো বেশি কাঁধ লাগান সংসারের জোয়ালে। ‘আমার দুডো ভাত জুটলি মারও জোটপে। আর যত কষ্টই হোক বাচ্চাগুনো মানুষ করে যাব।’ কীভাবে করবেন? জানেন না। শুধু জানেন ছেলেটা স্কুলে যায়। কোন ক্লাসে পড়ছে সে? কেমন পড়ছে? বোঝেন না। শুধু বোঝেন ‘ফাসট না হলি আবার কিসির পড়ালিকা!’  আমাকে প্রথম করার তাই সপ্রাণ চেষ্টা তার। কোনো কাজ করতে দেন না। চাল ডালের টাকা বাঁচিয়ে খাতা কলম কেনেন। অভাব বলতে একটু শুধু জুতো-জামার। ইদের পর ইদ যায়, নতুন জামাকাপড় পরা হয় না আমাদের। হলেও, নিক্সন পট্টি থেকে, সস্তা দোকান থেকে, সবচেয়ে কমদামী জামাটা বেছে বেছে কিনে দেন বলে, একবার পরার পরই বাদামি গায়ের রঙ আমাদের বদলে যায় কাপড়ের রঙে! অবুঝ চোখগুলো গরীব বাবার অক্ষমতাটা স্বভাবতই এড়িয়ে যায়। প্রায়ই ইদে মুখ গোমরা করে বসে থাকে ছোটভাইটা, ছলছল চোখে ঘুরে বেড়ায় বোন। আমারও তো মন খারাপ। তবু, বড় বলেই বোধহয়, ওদের বুঝ দিই- ‘মন খারাপ করিসনে, বড় হলি দেকিস ডবল ডবল জামাকাপড় কেনবো ইদির জন্যি। আর আব্বার জন্যি এ্যাটটা করে- কিপটেমির মজা তকন বোজবে!’ সেই মজা দেখানোর জন্য হলেও তো আমার বড় হওয়া দরকার, ভালো পড়াশোনা করার দরকার। কিন্তু করি না। প্রথম হই না কখনো। আমার কাজ শুধু খেলা। আর গল্পের বই পড়া। আর আলিফ লাইলার পরবর্তী পর্বের ঘটনা নিয়ে গবেষণা করা। আর আকাশ কুসুম কল্পনা। কিন্তু কল্পনাও তো সত্য হয়ে যায় মাঝে মাঝে। আমিও তাই ‘ইশকুল-ফাসট’ হয়ে যাই এসএসসিতে। আব্বার আনন্দ তখন দেখে কে! কত কত বিগত কষ্ট আর বহতা বঞ্চনার বিপরীতে তিনি দাঁড় করিয়ে দেন মামুলি সেই ভালো একটা ফলকে। মানুষ তার দিকে কেমন একটা নতুন চোখে তাকাচ্ছে, বেশ একটু গুরুত্বও যেন দিচ্ছে- বলতে বলতে কাঁদেন। কাঁদতে কাঁদতে হাসেন। হাসিমাখা সেই কান্নাটা ধরতে চাই গানে, পারি না।

চাচাত এক ভাই বাবা হয়েছে নতুন, ছোট বেতনের চাকরি। ছেলের জন্য ইদের কেনাকাটা করতে গিয়ে পড়েছে বিপদে। যা পছন্দ হয় সবই সাধ্যের বাইরে। আবার যা কিনছে তাতে মন উঠছে না। বলতে গেলে সারা মার্কেট ওর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে মনে হলো, পারলে কি বাবারা পুরো পৃথিবী এনে ফেলে দিতে চান সন্তানের সামনে? না পারলে সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষ মনে হয় নিজেকে তাদের? ভাবতে ভাবতে আব্বার মুখটাই ভেসে ওঠে মনে। শৈশবের হাটে কাদাছোটা পথ ধরে হনহন হেঁটে যাচ্ছি, কষ্টে অভিমানে ফুঁসছি, চোখে পানির ঢেউ। পেছন থেকে ভেসে আসে বাবার অনুনয়, ‘মন খারাপ করিসনে বাপ, ওই জামাডা রেকে দিতি বলিচি। আসচে ইদির সুমায় কিনে দুবানে।’ প্রতি ইদেই এমন তেমন কথা দেন বাবা, আর দেন বলেই বোধহয় রাখতে পারেন না সে কথা। তাছাড়া, আসছে ইদে ওই জামা পুরোনো হয়ে যাবে না? ভাবতে ভাবতে আমি আরো জেদে আরো জোরে হাঁটি। আর আমাকে সামলাতে গিয়ে পিছলে পড়েন বাবা। ছেলের গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে এই যে তার পিছলে পিছলে পড়া, তা কি শুধু বৃষ্টি-কাদার দোষেই, আমার অশ্রুর দায় কি ছিল না একটুও? এই এতবছর পর সেসব ভাবতে ভাবতে অপরাধ বোধ হয়। কিছু চেয়ে না পেলে সন্তান কাঁদে; কিন্তু সেই কান্না দেখে বাবা যে আরো বেশি কাঁদেন- ভাবিনি কোনোদিন। সন্তানের চাওয়া পূরণ করতে না পারলে কী যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায় বাবাদের বুক, বুঝবার চেষ্টা বোধহয় খুব কম সন্তানই করেন। এসব ভেবেই, মাস ছয়েকের প্রচেষ্টায়, দুটো লাইন লিখতে পারলাম, ‘এই জীবনের পরে আমি আবার জীবন পেলে/ হবো আমার বাবার বাবা, বুকে স্নেহের সাগর ঢেলে।’ সঞ্চারি হিসেবে দারুণ হবে। কিন্তু ওটুকুই শেষ, আস্থায়ী আর আসে না, অন্তরা আভোগ তো দূরের কথা। স্মৃতির রীলটাকে তাই আরো চলতে দিয়ে অপেক্ষা করি আরো মোক্ষম কোনো স্মৃতির।

এক বিকেলে ভেসে ওঠে গভীর এক গরম রাতের ছবি।

আলকাতরার ঘন কালো রঙ মেখে দাঁড়িয়ে আছে গাছ, সারি সারি। পথটুকু তবু আলো হয়ে আছে, সাদা মাটির বুক চিতিয়ে ধরে শুয়ে আছে আকাশে চোখ মেলে। তার উপর ভারি পা ফেলে, ফিতে ছেঁড়া ক্ষয়ে যাওয়া চপ্পলে চটাং চটাং আওয়াজ তুলে, এগিয়ে আসছেন বাবা। মাথায় মণখানেক এক বোঝা। কাটানোর পর বাতিল কাঠের অবশিষ্ট অংশগুলো মালিকের প্রাপ্য। সেগুলো জ্বালানি হিসেবে বিক্রি হয়। মিস্ত্রী হিসেবে একটু কম দামে সেটা কিনতে পারেন বাবা। রান্নার জন্য মাকে তাই কষ্ট করে খড়কুটো গুছাতে হয় না। চাচি ফুপুরা বলেন তার রাজকপাল। সেই কপালের জোরেই আমি ভালো ফল করেছি এইচএসসিতেও। ভর্তিপরীক্ষার ফল বলছে দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ আমায় ডাকছে। খবর শুনে আব্বাকে দেখে সমীহ করছে লোকে, ঈর্ষা করছে, বলছে তারও নাকি রাজকপাল। তবে দুটো রাজকপাল জোড়া দিয়েও কাজ হচ্ছে না; পরশু আমার ভর্তির দিন, কাল সকালে রওনা করার কথা, অথচ টাকা জোগাড় হয়নি। আজ সকালে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কথাটা দুখীরাজাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যোগ্যদুখীরানী। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সারাদিনই বাবা একে তাকে ধরেছেন কিছু ধারের জন্য, পাননি। মিল-মালিক বলেছেন পাওনা টাকা থেকে সন্ধ্যায় কিছু দেবেন। কিন্তু বাবাকে বসিয়ে রেখে সেই যে তিনি বেরিয়েছেন, ফেরার আর নাম নেই। অবশেষে রাতদুপুরে, এই তো কিছুক্ষণ আগে, ফিরেছেন লাটসাহেব। তারপর যে কটা টাকা তিনি গুঁজে দিয়েছেন হাতে, দরকারের কাছে তা কিছুই না। তবু, তা-ই তার সম্বল। লুঙ্গির গাঁটে গুঁজে নিয়ে বাবা পা যখন বাড়িয়েছেন, রাত তখন গভীর ঘুমে। অমন নির্জনতায় ওই রাস্তায় বিপদ অনেক। না, দেও দানোর চিন্তা তার নেই, কিন্তু মানুষ-দানোই কি আরো বেশি ভয়ংকর না এখন? পায়ের চটাং চটাং শব্দটা তাই কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে ভয়ে। ভয়টা সত্যি হয়ে গেল কিছুদূর যেতেই। ঘন বন যেখানে জঙ্গল গড়ে আছে, পথের গায়ে ঠিক সেখানে গোটাপাঁচেক বিড়ির আগুন জোনাক হয়ে জ্বলছে। দেখতেই ‘আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া! কী করি? টাকা কডা উরা নিয়ে নিলি তো সব্বনাশ। ছেলেডার ঢাকায় যাওয়ার কী হবে?’ ভাবতে ভাবতে মুষড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। লোকেরা তাকে দেখে এগিয়ে আসতেই, তারা কিছু বলে ওঠার আগেই তাই, কাঁপতে কাঁপতে গলা ছাড়লেন তিনি। ‘আপনিদের পেয়ে খুব উপগার হলো, ভাই! লুঙির গিঁট খুলে গিয়েচ, বুজাটা যদি এটটু ধরতেন, লুঙিডা ঠিক করে নিতি পারতাম।’ কী মনে করে তারা এগিয়েও এলো। তারপর দুজন মিলে ধরল বোঝাটা। ধরতেই উঠল কঁকিয়ে। এত ওজনের বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি হাঁটছেন কী করে! ‘গরীব মানুষ ভাই, কত বুজাই তো টানতি হয়, বুজা টানার কি শেষ আচে!’ বলে দ্রুত মাথায় নেন বোঝাটা। হালকা হওয়ার সুযোগ পেয়েই যেন বর্তে যায় লোকেরা। হয়তো ভাবে এমন লোকের পকেটে কী আর এমন ধন দৌলত থাকবে ছিনতাই করার মতো? ছেড়ে দেয় বাবাকে তারা। তাদের বিড়ির আগুনে বিড়ি ধরিয়ে হাঁটা ধরেন আব্বা। আর বলে আসেন ‘একেনে শুনিচি জায়গাডা ভালো না। কনতে কিরাম বিপদ আপদ আসে না আসে, সাবদানে থাকেন!’ ঘরের পটেয় বসে গল্পের মতো করে ঘটনাটা বলতে বলতে গড়িয়ে পড়েন বাবা। ভোরের আলোর মতো হালকা মধুমাখা হাসিটা তার স্বস্তির আর সফলতার। অমন ‘বোকামানুষটা’ও যে কাউকে বোকা বানাতে পারে তা ভেবে অবাক হওয়ার। মিষ্টি সেই বোকা হাসিটাও আঁকতে পারি না গানে।

চমৎকার বাঁশি বাজান বাবা। বাঁশের বাঁশি। অকৃত্রিম তার সুর। অপ্রতিম তার টান। রাতের আঁধার তাতে মাতাল হয়। ঘুম ঘুম কানগুলোতে সে টান মধু ঢালে। কেউ মধু শুনে ঘুমায়; কেউ জেগে থাকে, সারারাত। তার গানের গলাও ভালো। প্রায়ই গেয়ে ওঠেন ‘মরমিয়া তুমি চলে গেলে দরদি আমার কোথা পাবো..।’ কিংবা ‘বহুদিনের পিরিত গো বন্ধু একই দিনে ভেঙো না..!’ এমনই দু’একটা গল্পখুশির মুহূর্ত নিয়ে জীবন যখন সঙ্গী হয় তার, আঁকতে পারি না তখনকার রঙিন মুখের ছবিটাও।

সময়ের পথ বয়ে চলে। বয়েই চলে। তাই ফুরিয়ে যায় দিন, বুড়িয়ে যায় রাত। আমাদেরও চলে গেছে দিন- অনেক মেঘে, অল্প রোদে, আর অত্যল্প জোছনায়। ঠেলেঠুলে ততদিনে পড়াশোনা শেষ হয়েছে আমার, জুটেছে একটা চাকরিও। দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েই বাবা হয়ে উঠি আমি। মনে হয় বইয়ের ফাঁকে আগলে রাখা ময়ূর-পালকের মতো এবার যত্নে রাখব বাবা মাকে। মায়ের জন্য সাহায্যকারী  ঠিক করে দিই একজনকে। বাবাকে বলি কাজ ছেড়ে দিতে, এই বয়সে ওই ভূতের বেগার খাটার দরকার নেই আর। বাধ্য ছেলের মতোই কথা শোনেন বাবা। কিন্তু বাবা মায়ের জীবন তো ছোটগল্প, কোনো তীরেই ঠিকমতো ভেড়ে না তাদের তরী। কষ্টপোড়া বুক তাদের এতই বেয়াড়া, একটুখানি সুখ পেলেই বদহজম। কিছুদিন যেতে না যেতেই তাই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। গায়ে বল পাচ্ছেন না, শুকিয়ে যাচ্ছে পায়ের পাতা। গা হাত পা জ্বলে, সঙ্গে আছে বাতের মতো ব্যথা। এর মধ্যেও আমাকে লুকিয়ে নাকি কাজে যান। লোকে তাকে বকে। বকলে তাদের উল্টো বকেন, ‘খুকার এত কষ্টের টাকা, বসে বসে খাই কোন মুখে!’

ছোট ছোট চাওয়া তার। পূরণ করলেই খুশি হয়ে যান বাচ্চাদের মতো। দামি কিছু খেতে চান না। দামি জামা নামী জুতো পরতে চান না। ডাক্তার বেশি বেশি ওষুধ লিখলে বাড়ি ফিরে গালাগাল করেন ডাক্তারকে- সবাই মিলে ছেলেটার টাকা খরচ করাতে উঠে পড়ে লেগেছে! তখন আমি বকি তাকে। শুনে তিনি হাসেন। বোকা বোকা বাচ্চা বাচ্চা হাসি। আহা! ওই হাসিটা যদি ধরে রাখা যেত!

এত ডাক্তার দেখাই, কোনোই উপকার হয় না। দিনে দিনে রোগ ওঠে পায়ের পাতা থেকে গোড়ালি, সেখান থেকে হাঁটু, হাঁটু থেকে উরু। যে পায়ে হেঁটে হেঁটে বাধা সরিয়েছেন আমাদের পথের, সেই পা-ই শুকিয়ে যাচ্ছে, ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। আমি কিছুই করতে পারছি না। খুব অসহায় লাগে, অভিশপ্ত লাগে। থাকি দূরে, কিন্তু মন পড়ে থাকে ওই পায়ে। এসব ভেবে একটা লাইন লিখি: ‘কিন্তু কোনোদিনই/ ওই পায়ে হাত বুলোতে পারিনি।’ এর আগে কী? পরে কী? মাথায় আসে না।

তারপর এক সন্ধ্যাজাগা রাতে, মাকে নিয়ে গানটা লেখার ছয় বছর পর, বাবার জন্য পছন্দসই একটা অন্তরা লিখতে পারি। ‘তোমার পায়ে দু’পা রেখে শিখেছিলাম হাঁটা/বাবা, তোমার পায়েই বিঁধেছিল আমার পথের সকল চোরাকাঁটা/ কিন্তু কোনোদিনই/ওই পায়ে হাত বুলোতে পারিনি।’ এটুকুতেই স্বস্তি লাগে আমার। এটা সম্পূর্ণ হতে সময় লাগবে হয়তো, গীত হতেও বহু দেরি, অত তর সইবে না; গ্রামে গিয়েই এবার আবৃত্তি করে শোনাব, চমকে দেব তাঁকে! আমার খুশির সুবাস মেখে সে রাতে মত্ত হলো মাতাল ছাতিম ফুল। গলে পড়ল চাঁদের মতো তারা। বাবা হয়তো এখন বাঁশি বাজাচ্ছেন। উঠোনে শুয়ে বাজাতে বাজাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন এক রাতে, সকালে তার ঝাকড়া চুলের ঝোঁপ থেকে সাপ বেরিয়ে পড়তেই চাউর হয়ে গিয়েছিল কথাটা। কিংবদন্তীর মতো সেই কথাটা শুনতে আমার কাছে রূপকথার মতো লাগত। তেমন করেই বাঁশির সুরে তিনি হয়তো মাতাল করে তুলেছেন প্রকৃতিকে। রাত হয়তো ঢলে ঢলে পড়ছে সাপের মতোই। সেই সুর কল্পনা করেই শ’চারেক মাইল দূরে বসে আমি তাঁকে নিয়ে লেখা গানটা আওড়াতে লাগলাম। আর আমার স্বরে জড়িয়ে গেল ডুকরে ওঠা কান্নারঙের ঢেউ। সকালে ঘুম ভাঙলো প্রতিবেশির ফোনে। গোসল করতে বাঁওড়ে ডুব দিয়েছিলেন বাবা, ভেসে ওঠেননি আর। ঘন্টাখানেক খোঁজাখুঁজির পর ডাঙায় যখন তোলা হয়েছে তাকে, তখনও তার চোখ খোলা, মুখে যন্ত্রণার ছাপ।

সে যন্ত্রণায় নীল হয়ে ছুটে যাচ্ছি- মুখটা ছুঁয়ে দেখব শেষবারের মতো, চুমু খাব বাবার পায়ে। কানে বাজছে বাবার কথা, চোখে ভাসছে তার মলিন শিশুমুখ। আহা, কত অবহেলাতেই না কেটেছে জীবনটা তার! কাজ করিয়ে নেওয়া ছাড়া এতটুকু গুরুত্বও দেয়নি তাকে কেউ। শরীর কুরে জীবন কুরে গড়েছেন যে সংসার, সে সংসারও কি দিয়েছে তার প্রাপ্যটুকু?

হাড়িকুড়ির সংসার, খুটিনাটি বাঁধেই; গরীব হলে সেটা বাজে একটু বেশিই। দাম্পত্যে সহযোগী বাবা-মা। সংসারে দুজনেরই বিনিয়োগ আছে, আছে ত্যাগের পাহাড়; দুজনেরই কষ্ট আছে, আছে বঞ্চনার ইতিহাস। একের উপর অন্যের অভিযোগেরও তাই শেষ থাকে না। এসবের যোগে বিয়োগে কখন যেন তারা হয়ে দাঁড়ান প্রতিপক্ষ। সন্তানের সাথে মায়েরই নৈকট্য থাকে বেশি। মা’র ক্ষতগুলো দেখার সুযোগ সহজেই তাদের হয়। কথায় কথায় মা-ও তাদের চিরে দেখান বুক; বাবা দেখান না, দেখানোর সুযোগও পান না। সীমা ছাড়ালে মাঝে মাঝে একটু ফাঁপা চিৎকার আর মাপা চেচামেচি করেন হয়তো, হম্বিতম্বি করেন, কিন্তু পাল্টা অভিযোগ করেন না। বাবার ভাষ্য না জেনেই সন্তানরা তাই মায়ের পক্ষ নিয়ে ফেলে। কথাও বলে মায়ের সুরে। বিপত্তিটা এখানেই- মায়ের কথায় মান থাকে, অভিমান থাকে; দুজনের রসায়ন অনুযায়ী টান থাকে, প্রেম থাকে; কিন্তু সন্তান তো তৃতীয়পক্ষ, তাদের কথায় পড়ে থাকে শুধুই অভিযোগ। বাবার সঙ্গে তাদের কেমন যেন একটা দেনাদার-পাওনাদার সম্পর্ক হয়ে যায়, দিতে পারলে ভোঁতা একটা ধন্যবাদও মেলে না বাবার, না দিতে পারলে তীক্ষ্ণ তিরস্কার! ইচ্ছে করেই যেন সন্তানের পাওনাগুলো শোধ করছেন না। ঋণদূরত্বে বসেই তাই রক্ত পানি করা ঘামে ভেজেন বাবা, সবার দুঃখ বুকে জ্বেলে পুড়তে থাকেন নিজের ভেতর। তাতেই যখন অভিযোগের ঘি ঢালে সন্তান, অসহ্য এক জ্বালা নিয়ে বুক তাদের জ্বলতে থাকে আরো।

এত তীব্র বেদনায় বাবাকে পোড়ানোর দুর্ভাগ্য আমাদের হয়নি। তবু, জেনে হোক না জেনে হোক, কিছু অবিচার তো করেইছি; সেসব বেদনার বিষ ঠোঁটে নিয়েও মানুষটা এত সুন্দর করে হাসতেন কী করে? ভেতরে যন্ত্রণা পুষে বাইরে তিনি আনন্দ বুনে গেছেন আমাদের জন্য। ভাবনায় আমার দম আটকে আসে। কান্নায় আমার গলা ফেটে যায়। সারাপথ কাঁদলাম খুব। আর জ্ঞান হারালাম বারবার। তার মধ্যেই ছুটে এলো গানটার আভোগ [সঞ্চারী না থাকলে যার নাম হবে দ্বিতীয় অন্তরা]। ‘তোমার চোখে দেখে দেখে চিনেছিলাম আলো/বাবা, তোমার আলোয় ঘুচেছিল আমার চোখের গহীন আঁধার কালো/কিন্তু মরণরাতে/ওই চোখে দীপ পারিনি জ্বালাতে।’ এখন দরকার যুৎসই একটা আস্থায়ী। তাতে আব্বার যন্ত্রণার নীল আর ত্যাগের সাদা মেঘে ভেসে থাকা আকাশ-হৃদয়টা ধরা থাকবে। মিশে থাকবে তার শ্রমভেজা শার্টের আর্দ্রতামাখা বাঁশের বাঁশির মিহি সরল টান। রাঙা হয়ে উঠবে তার সূর্যপ্রভা সরল হাসির আভা। কিন্তু লিখতে বসে বুঝি শব্দবাক্যের মামুলি ইট-বালুতে অতবড় ইমারত গড়ার সামর্থ্য আমার নেই।
বাবাকে নিয়ে গানটা তাই ঠিকঠাক লেখা হয় না আমার।

[ঐহিক বাংলাদেশ প্রিন্টসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল]

2 thoughts on “বাবার জন্য গান

    1. আপনার ভালোবাসা ও প্রশ্রয় পাওয়া জীবনের এক অমূল্য প্রাপ্তি আমার, ভাই। আশীর্বাদ করবেন, লেখার শক্তিটুকু নিয়েই যেন বেঁচে থাকতে পারি। অশেষ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আপনার জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।