আশান উজ জামান

দেখা। লেখা। পড়া

বুকে আমার দুটো পায়ের ছাপ। একটা মায়ের। আরটা বাবার। দুটোই সমান। প্রভাবে ও স্বভাবে। চোখে আমার দুটো চোখের আলো। একটা বাবার। আরটা মায়ের। দুটোই সমান। দৃষ্টিতে ও স্বপ্নে। তবে এই লেখাটা মা’কে নিয়ে।

আর দশজন মা যেমন হন, আমার মা-ও তেমন। সাধারণ। অবিশেষ। কোনোভাবেই তাঁকে নিয়ে দুকলম লেখার কথা না কারও। সে কারণেই অসাধারণ তিনি। আর দশজন মা যেমন হন।

জোড়াতালি দেওয়া সংসার আমাদের। রিপুর উপর রিপু। এ ধামার কাঁঠাল ও ধামায়, সে জলের কই এ জলে রেখে চলতে হয়। বাবা থাকেন কাজের তালে, আমরা চলি মায়ের চাকায়। তিনিই আমাদের নিধিরাম সর্দার। খালি পেট। ভরা চোখ। সেই চোখে পড়ে আগামীর ছবি। রং নেই, তুলি নেই, চক-স্লেটে আঁকা সেই অগোছালো ছবিটায় আজকের চেয়ে ভালো থাকার প্রত্যয়। আজকের চেয়ে সুখী সূর্যের ঠিকানা। তাই আমাদের বাঁচতে শেখান তিনি। শিখতে শেখান। কিন্তু পথ ভুল করি আমরা। এলোমেলো চলি। পাথর হয়ে ওঠেন মা তখন। হয়তো পুকুরে ডুব দিচ্ছি স্কুল পালিয়ে, চুপিসারে এসে চুবিয়ে ধরেন। ভাত কম দেখে কাঁদছি হয়তো, হাত দেইনি প্লেটে; খেয়ে ফেলেন গপাগপ! শীত-সন্ধ্যায় না পড়ে লেপ গরম করছি, ঢেলে দেন কলসভরা পানি। এসবের ভয়ে আর ভারেই হয়তো পাল্টে গেছে পঞ্জিকার পাতা আর পায়ের নিচের মাটি। কিন্তু মায়ের দিন কি বদলেছে?

পিছল উঠোনে পড়ে গিয়ে তাঁর কোমর ভেঙেছে। চিকিৎসা দরকার। ঢাকায় নিয়ে এলাম। পড়াশোনা শেষ করেছি ততদিনে। ঘানি টানছি অফিসের। সন্ধ্যা মেখে ঘরে ফিরি। শুরু হয় তাঁর ছেলেমানুষি—এটা চাই। ওটা দাও। সেটা কই?
আহ্লাদে আদরে গলে যাওয়া স্বর। মিষ্টি আনো। দই নেই? সিঙাড়া খাব। কোক খাব। এগুলো তার প্রিয় খাবার। ‘বাপ তো কিছুই খাওয়ায়নি, তাই এসব খেতে চাও। ভালো কিছু চাইতে পারো না?’ খোঁচা মেরে বলি। ঠোঁটের ওপর লেগে থাকা দই বা মিষ্টির রসটুকু মুছতে মুছতে উত্তর করেন মা, ‘বাপই তো খাওয়াচ্ছে!’ কী যে শান্ত লাগে! বুক ভরে যায়। চোখ ভরে যায়। প্রশ্ন জাগে, মা কি আমার শুধুই মা?

আব্বা লেখাপড়া করেননি। তুলনায় শিক্ষিত মা। তিন ক্লাস পড়েছেন। আব্বার যেখানে পা ওঠে না, মা সেখানে দৌড়োন। আব্বা যেখানে মিটিমিটি, মা সেখানে আলোকধারা। রোগী মা-ই দেখে রাখেন সুস্থ আব্বাকে। অনিয়ম করলে, বিড়ি খেলে, লুকিয়ে কাজে গেলে, মা বলে দেন আমায়। মা ওষুধ না খেলে, অকারণ কান্নাকাটি করলে, আব্বা নালিশ করেন। আমি বকা দিই। শাসাই। টোনাটুনির এই চাপান উতোর, খুনসুটি আর বায়না দিয়ে একাকীত্বগুলো ভুলে থাকেন তাঁরা।
‘তাঁরা’ আর তাঁরা নেই এখন। আগে মায়ের না-খাওয়া, না-দাওয়া, না-পরা, ছড়ানো দিন ছিটানো রাতজুড়ে থাকত কাজ, কাজ, আর আব্বা। আব্বা না থাকায় ভীষণ একা হয়ে গেছেন মা ।

একা তিনি রোদে মেঘে। একা তিনি জোছনায়। যদিও ঘরভরা মানুষ আমরা। গল্প-আড্ডায় গমগম করি। রাজ্য মাতিয়ে রাখে পিচ্চিটাও (আমার ছেলে সাধ্য)। মা তবু জেগে থাকেন ঘুমের দেয়ালে টিমটিমে ডিমলাইটের মতো। অথবা ঘরময় জেগে থাকার আয়োজনে ঘুমোন এক পাশে। কাত হয়ে। এক হাত মাথার নিচে। আর হাত সামনে বাড়ানো। ওই হাতের নিচেই ছিলাম একসময়। বের হয়ে গেছি। তারপর ছিল বোনটা। তারপর ছোট ভাই। ওরাও বড় হয়েছে, ভার্সিটিতে পড়ে। হাত তবু বাড়িয়ে রাখেন মা। ধরে রাখেন শূন্যতাটুকু।

ওই শূন্যতা ভরিয়ে দেবার চেষ্টা করি। হেসে। গেয়ে। বেড়িয়ে। কিন্তু একের অভাব কি আর দশেও পূরণ হয়? তাই যখন আমরা ভেসে যাই উৎসবে, নোঙরের মতো ডুবে থাকেন মা। আটকে থাকেন তাঁর তোলা সেই কাঁচা দেয়াল আর টালির চালে। অথবা আব্বা এখন যেখানে, সেই ছোট্ট মাটির ঘরে।

১০ মে, ২০১৭ তারিখে প্রথম আলো’য় প্রকাশিত

মা আমার মা না, মেয়ে&rdquo লেখায় ১জন মন্তব্য করেছেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।